আহমেদ আকবর, সিলেট:
সিলেটের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়মনীতি না মেনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিউটি শিডিউল পরিচালনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, শয্যা সংকট এবং রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ও অসহায় রোগীরা।
ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ও নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে খাবার, ট্রলি, বেড ও অন্যান্য সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
খাবার বিতরণ নিয়ে অভিযোগ
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অনেক রোগী নিয়মিতভাবে সেই খাবার না পাওয়ায় বাইরে থেকে টাকা দিয়ে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন।
হাসপাতালের খাবার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, খাবার পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন।
শিশু ওয়ার্ডে শয্যা সংকট
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের পরিস্থিতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। শয্যা সংকটের কারণে একটি বেডে একাধিক শিশুকে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বলে রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, একই বেডে একাধিক রোগী থাকায় শিশুদের চিকিৎসা পরিবেশ যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুত শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি ও ওয়ার্ডের পরিবেশ উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ
হাসপাতালজুড়ে একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। তাদের দাবি, অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা বা আশ্রয়ে কিছু দালাল ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘোরাফেরা করে রোগীদের বিভ্রান্ত করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব দালাল রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা ফার্মেসিতে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অসহায় রোগীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ওয়ার্ড বয়দের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ
হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়দের বিরুদ্ধেও অর্থ দাবির অভিযোগ করেছেন রোগীদের স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘বকশিশ’ না দিলে অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায় না।
ট্রলি আনা-নেওয়া, রোগী স্থানান্তর কিংবা বেডসংক্রান্ত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্বজন। এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রসূতি ওয়ার্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের চিকিৎসাসেবা নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসার সময় ব্যবস্থাপত্রে যে পরিমাণ ওষুধের তালিকা দেওয়া হয়, তার কিছু অংশ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা অপ্রয়োজনীয় হতে পারে।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, প্রসবের পর ব্যবহৃত না হওয়া কিছু ওষুধ রোগীদের ফেরত না দিয়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।
প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি
সরকারি এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নানা ধরনের অতিরিক্ত অর্থের চাপে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।
তাদের দাবি, হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ওয়ার্ড পরিদর্শন, খাবার বিতরণ ব্যবস্থার তদারকি, দালাল শনাক্তকরণ, কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ এবং রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।


