এসএসসি পাসের দুই দিন পর সাপের কামড়ে প্রাণ গেল সোনালীর, মায়ের শেষ আশ্রয়ও হারাল
বেড়া (পাবনা) প্রতিনিধি:
এসএসসি পরীক্ষায় পাসের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই সাপের কামড়ে প্রাণ গেল পাবনার বেড়া উপজেলার দুর্গম চর মিরপুর গ্রামের সোনালী আক্তারের। বিষধর সাপের কামড়ের পর হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় এক ওঝার কাছে নিয়ে গিয়ে ঝাড়ফুঁক করায় চিকিৎসায় দেরি হয় বলে জানা গেছে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় সদ্য এসএসসি পাস করা এই কিশোরীর।
সোনালী দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা মারা যাওয়ার পর মা রাশেদা খাতুন মেয়েকে ঘিরেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছিলেন। এর আগে আরেক মেয়েকেও হারিয়েছেন তিনি। ফলে সোনালীই ছিলেন তাঁর শেষ আশ্রয় ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলে সোনালী জিপিএ ৩.৫৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। মেয়ের সাফল্যে পরিবার ও বিদ্যালয়ে ছিল আনন্দের আবহ। কিন্তু ফল প্রকাশের মাত্র দুই দিনের মাথায় সেই আনন্দ পরিণত হয়েছে শোকে।
জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে মায়ের সঙ্গে পাশের বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে ফিরছিল সোনালী। পথে বিষধর সাপ তাকে কামড় দেয়। এরপর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় এক ওঝার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে ঝাড়ফুঁক। একপর্যায়ে সোনালী অচেতন হয়ে পড়ে।
পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথে মৃত্যু হয় সোনালীর।
সোনালীর মৃত্যুর খবরে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ে এসএসসি ফলাফল উপলক্ষে আনন্দ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়েই তাঁদের মধ্যে কথা হয়। যে মেয়েকে নিয়ে দুদিন পর বিদ্যালয়ে আনন্দ করার কথা ছিল, সেই মেয়েটিই তখন মৃত্যুর পথে।
শিক্ষক-সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোনালী শুধু পড়াশোনায়ই ভালো ছিল না; সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্কাউটিং ও খেলাধুলাতেও তাঁর আগ্রহ ছিল। প্রাণবন্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের কারণে বিদ্যালয়ে সবার কাছেই সে ছিল পরিচিত মুখ।
মেয়েকে হারিয়ে মা রাশেদা খাতুন এখন দিশেহারা। তাঁর প্রশ্ন, “আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব?” এই একটি বাক্যেই ফুটে উঠেছে সন্তানের মৃত্যুর পর একজন মায়ের অসহায়তা ও শূন্যতা।
সোনালীর এই মৃত্যু আবারও সামনে এনেছে সাপের কামড়ের পর দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসার গুরুত্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনা অনুযায়ী, বিষধর সাপের কামড়ের সন্দেহ হলে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে এমন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে, যেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ঝাড়ফুঁক, ভেষজ বা অন্যান্য অপ্রমাণিত চিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। রোগীকে শান্ত ও স্থির রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
সাপের বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো গেলে অনেক ক্ষেত্রেই জীবন রক্ষা সম্ভব।
সোনালীর চলে যাওয়া আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে তাঁর মৃত্যু যদি অন্য কোনো পরিবারকে সাপের কামড়ের পর ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের পরিবর্তে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করে, তাহলে হয়তো আরেকটি প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।
সদ্য এসএসসি পাস করা সোনালীর সামনে ছিল আরও পড়াশোনা, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ গড়ার অসংখ্য সম্ভাবনা। কিন্তু ফল প্রকাশের মাত্র দুই দিনের মাথায় আকস্মিক সাপের কামড়ে থেমে গেল তাঁর জীবন।


