নিজস্ব প্রতিবেদক: বার্তা সিন্ধু ডট কম, এম এইচ রাকিব
চলতি বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতি থাকলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বাস্তবিক জটিলতার কারণে শিগগিরই ভোট আয়োজন করা কঠিন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে সবকিছু অনুকূলে থাকলে আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভাব্যভাবে আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময়সূচি নির্ধারণ করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রমজানের আগে প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি ইসিতে আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করা, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োগ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনসহ নানা বিষয় জড়িত।
বছরের শেষ দিকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্কুল-কলেজকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে চলতি বছরের পরিবর্তে আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন আয়োজনকে তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক পরীক্ষার চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে। এতে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে শীতকালীন আবহাওয়াও ভোট আয়োজনের জন্য অনুকূল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
নভেম্বরকে লক্ষ্য করে প্রস্তুতি
এদিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নভেম্বরকে লক্ষ্য করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোট চলতি বছরের শেষ দিকে হবে, নাকি আগামী বছরের শুরুতে গড়াবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতেও নির্বাচন হতে পারে। এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকারের ভোট শুরু করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
মাঠে রাজনৈতিক প্রস্তুতি
নির্বাচনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার পাশাপাশি দলীয় সমর্থন পাওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন একাধিক ধাপে আয়োজনের সম্ভাবনাও রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কয়েক ধাপে সম্পন্ন করার পর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও বিস্তৃত পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের মতো বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন আয়োজন করতে পৃথক প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
জানুয়ারিতে ভোটের পক্ষে মত
নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, নভেম্বর ভোট আয়োজনের জন্য উপযুক্ত সময় নয়। তার মতে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন জানুয়ারিতে গড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি।
তিনি বলেন, শীতের সময় নির্বাচন হলে ভোটারদের অংশগ্রহণের পরিবেশ ভালো থাকবে। মফস্বল এলাকায় শীতের সময়ে ভোটকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও উৎসাহও বেশি দেখা যায়।
সাইফুল হকের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পাঁচ থেকে ছয় ধাপে হতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। ফলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস সময় লাগতে পারে এবং আগামী বছরজুড়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
দলীয় প্রতীক ছাড়াই প্রার্থী দেবে বিএনপি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থানও জানিয়েছে দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, বিএনপি এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে।
তবে দলীয় প্রতীক বা দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তৃণমূল পর্যায়েই প্রার্থী বাছাই ও চূড়ান্ত করা হবে এবং দল থেকে তাদের সমর্থন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রিজভী আরও বলেন, নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত ও শৃঙ্খলা কঠোরভাবে মানতে হবে। কেউ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় নির্বাচনে কারা অংশ নিতে পারবেন বা পারবেন না, সেটি নির্বাচন কমিশন ও আদালতের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রচলিত আইন ও নতুন প্রণীত আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে ইসি সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান বিএনপির এই নেতা।
শরিক দলগুলোরও প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ও দলীয় মনোনয়ন না থাকায় বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোও নিজ নিজ প্রার্থীদের মাঠে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় শরিক দলগুলোর সাংগঠনিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, সেখানে তারা নিজেদের যোগ্য প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি বিএনপির সমর্থনও চাইতে পারে।
তবে কোনো জোটগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী শীতের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, নির্বাচন আয়োজনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আলোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জনগণ যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে পারে, সে জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা জরুরি। শীতের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা ভালো হবে বলে মত দেন তিনি।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি শুরু হলেও ভোটের সুনির্দিষ্ট তারিখ, ধাপ এবং কোন নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি।
বার্তা সিন্ধু ডটকম


