
প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে মামলা-পাল্টা মামলায় থমকে আছে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। আদালতে মামলা ঝুলে থাকায় আটকে আছে প্রায় ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক পদের নিয়োগ। ফলে বছরের পর বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে বিদ্যালয়গুলো।
শিক্ষার্থী থাকলেও নেই প্রধান শিক্ষক। শুধু একটি-দুটি নয়, ঢাকার কোতোয়ালি থানার ৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২০টিতেই একই চিত্র। অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক পদও শূন্য। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশের প্রায় ৩৪ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে। বছরের পর বছর সহকারী শিক্ষকেরাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
নবাব কাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণ কান্ত বাড়ৈও এমন বাস্তবতার শিকার। চাকরির ২৫ বছর পার হলেও পাননি পদোন্নতি। দায়িত্ব বেড়েছে, কিন্তু মেলেনি প্রধান শিক্ষকের স্বীকৃতি।
তিনি বলেন, ‘অনেক বড় কষ্ট যে এত বছর চাকরি করলাম, কিন্তু কোনো পদোন্নতি হলো না। আমাদের অনেক সহকর্মী পদোন্নতির যোগ্য ছিলেন, দক্ষতাও ছিল, কিন্তু তারাও পদোন্নতি পাননি।’
একই রকম হতাশা অন্য শিক্ষকদের মধ্যেও। তাদের দাবি, সিনিয়র শিক্ষকদেরই পদোন্নতি হচ্ছে না, সেখানে নিজের পদোন্নতির আশা করাও কঠিন। দীর্ঘদিন সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তারা এখনো পদোন্নতির অপেক্ষায়।
মূলত ২০১৯ সালে একটি মামলার পর থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে। ফলে দেশের প্রায় অর্ধেক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে।
একই ধরনের মামলার জটিলতায় ভুগছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগও। নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিওভুক্তি, জাল সনদসহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ধরনের মামলা নিয়মিত হচ্ছে। এসব মামলার সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি।
রাজধানীর উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজেও একই সংকট। প্রধান শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বৈধতা-অবৈধতার জটিলতায় চার বছর ধরে পদটি শূন্য। নিয়োগ অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় অনিশ্চয়তায় রয়েছেন ১৬ জন শিক্ষক। মামলার কারণে নতুন প্রধান শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না।
স্কুলের এক অভিভাবক ও মামলার বাদী বলেন, ‘কমিটি, সভাপতি এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। এমনকি শিক্ষকরা শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকের বিরুদ্ধেও মামলা করেছেন।’
উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ফরিদুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের মামলা থাকা উচিত নয়। দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। আমরা চাই না একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বারবার প্রধান পরিবর্তন হোক।’
হাজারো মামলার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ হাইকোর্টে শিক্ষা-সংক্রান্ত মামলার জন্য আলাদা বেঞ্চ গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যদি একটি বিশেষ আদালত বা বেঞ্চ গঠন করে এসব মামলা একসঙ্গে শুনানি করা যায়, তাহলে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে।’
এদিকে মামলার জট নিরসনে আলাদা বেঞ্চ গঠনের চিন্তা করছে সরকার। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীদ রুশদ হক বলেন, ‘বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বা দুটি নির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন করা হতে পারে। কারণ একই ধরনের কয়েকটি মামলার রায় হলে বাকি অনেক মামলারও সমাধান হয়ে যাবে।’
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মামলার বড় একটি অংশ হয়রানিমূলক। এর পেছনে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনীতি দায়ী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমি পদোন্নতি পাইনি, তাই অন্যকেও হতে দেব না; অনেকের মধ্যে এমন মানসিকতা কাজ করে। পদটি শূন্য থাকলে দুই পক্ষই নানা সুবিধা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে মামলা বাড়ছে। এ জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও দায় রয়েছে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলমান মামলার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে অধিকাংশ মামলাই হয়েছে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর।
M.H. - Rakib
© স্বত্ব সংরক্ষিত © বার্তা সিন্দু ডট কম